★ চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির হৃদস্পন্দন। এই বন্দর অচল মানেই দেশের অর্থনৈতিক চাকা থমকে যাওয়া।
★ বন্দরে টানা কর্মবিরতি ও নতুন ধর্মঘটে রফতানি–আমদানিতে বড় ধাক্কা।
★ ১৩ হাজার কনটেইনারে আঁটকা আনুমানিক ৬৬ কোটি ডলারের রপ্তানি পণ্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক আস্থায় গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
★ দ্রুত সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান না হলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। মোট আমদানি-রফতানির প্রায় ৯২ শতাংশ এই বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়। কিন্তু সেই বন্দর যখন দিনের পর দিন অচল থাকে, তখন তার অভিঘাত শুধু বন্দর এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না—তা ছড়িয়ে পড়ে শিল্পকারখানা, রফতানি আদেশ, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং সাধারণ ভোক্তার জীবনযাত্রায়।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শ্রমিক-কর্মচারীদের টানা আন্দোলন ও কর্মবিরতির ফলে চট্টগ্রাম বন্দর কার্যত গভীর সংকটে পড়েছে। ছয় দিনের কর্মবিরতির পর সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরু হলেও এখনও স্বাভাবিক গতি ফেরেনি। বরং নতুন করে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ঘোষণায় সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
গত ৩১ জানুয়ারি এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। তারা অভিযোগ করেন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাদের সঙ্গে কোনও কার্যকর আলোচনা হয়নি। এর পরপরই কয়েকজন কর্মচারীকে বদলি করায় উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। প্রথমে প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করা হলেও পরে তা টানা কর্মসূচিতে রূপ নেয়। এক পর্যায়ে জাহাজ চলাচলও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, যা চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
গত বৃহস্পতিবার বিকালে দুই দিনের জন্য কর্মবিরতি স্থগিত করা হলেও বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে পারেনি। জোয়ার-ভাটার সময়সূচি ও টানা অচলাবস্থার ধাক্কায় পুরো অপারেশনাল ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ে।
শুক্রবার সকালে জোয়ারের সময় জেটিতে আটকে থাকা জাহাজগুলো বহির্নোঙরে পাঠানো হলেও বিকাল পর্যন্ত পূর্ণ গতি ফেরেনি। টার্মিনাল গেটে ট্রাকের দীর্ঘ সারি দেখা যায়।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বন্দরের ইয়ার্ডে জমে আছে ৩৮ হাজারের বেশি টিইইউএস কনটেইনার। এর মধ্যে প্রায় ২৯ হাজারের বেশি এফসিএল কনটেইনার।
রফতানি কনটেইনারের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আরও জটিল। বন্দরে আটকে আছে প্রায় ১ হাজার টিইইউএস রফতানি কনটেইনার। বেসরকারি আইসিডিতে রয়েছে ১৩–১৪ হাজারের বেশি
বিভিন্ন ডিপোতে আছে প্রায় ১ হাজার ৫০০
কমলাপুর আইসিডিতে পাঠানোর অপেক্ষায় আরও ১ হাজার ৭৫০টি।
বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ রয়েছে— ৫০টির বেশি কনটেইনার জাহাজ, ১০০টির বেশি বাল্ক ক্যারিয়ার
জ্বালানি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কার। প্রতিটি জাহাজের জন্য দৈনিক ১৫ থেকে ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যেই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে শত শত কোটি টাকায়।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তৈরি পোশাক খাত। অনেক ফিডার ভেসেল নির্ধারিত কনটেইনার না নিয়েই বন্দর ছেড়ে গেছে। এতে ইউরোপ ও আমেরিকাগামী পণ্যের চালান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজান বলেন,
“এই জট কাটাতে অন্তত দুই থেকে আড়াই মাস সময় লাগতে পারে। এটি শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর বড় আঘাত।”
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ৮০০-এর বেশি কনটেইনার কাঁচামাল বন্দরে আটকে আছে। প্লাস্টিক ও ইলেকট্রনিক শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
একদিকে কাঁচামাল আটকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে তৈরি পণ্য আটকে রফতানি বিলম্বিত হচ্ছে—যাকে উদ্যোক্তারা ‘ডাবল শক’ বলে অভিহিত করছেন।
৬৬ কোটি ডলারের রফতানি ঝুঁকিতে: ইউরোচেম
ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স (ইউরোচেম বাংলাদেশ) জানিয়েছে, প্রায় ১৩ হাজার কনটেইনারে আটকে আছে আনুমানিক ৬৬ কোটি ডলারের রপ্তানি পণ্য। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সরবরাহ সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর বড় আঘাত হানতে পারে।
বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দর তৈরি পোশাক শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। এখানে বিঘ্ন মানেই উৎপাদন ও রফতানিতে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব।”
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) জানিয়েছে, বর্তমানে ৫৪ হাজারের বেশি কনটেইনার বন্দরে আঁটকে আছে। এতে ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন কনটেইনারপ্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ করছেন।
আন্দোলনে জড়িত ১৫ জন কর্মচারীর সম্পদ তদন্তে দুদকে চিঠি দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার আবেদন করা হয়েছে। এতে শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ রবিবার সকাল ৮টা থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। তাদের চার দফা দাবি—
১. এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা না দেওয়া
২. চেয়ারম্যান প্রত্যাহার
৩. বদলি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার
৪. মামলা প্রত্যাহার
এদিকে বন্দরে আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্ঠির অভিযোগে শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাত থেকে রবিবার সকাল পর্যন্ত বন্দর এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে তাদের ৬ জন শ্রমিক কর্মচারীকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন। বন্দর চেয়ারম্যান শক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলন দমন করতে চাইছেন। শক্তি প্রয়োগ হলে আরও কঠিন আন্দোলন গড়ে তোলা হবে এবং আলোচনা ছাড়া শক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলন দমানো যাবে না বলেও হুঁশিয়ারী উচ্ছারন করেন তিনি। তবে শ্রমিক কর্মচারীদের তুলে নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট এখন কেবল শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি জাতীয় অর্থনীতি, রফতানি সক্ষমতা ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির হৃদস্পন্দন। এই বন্দর অচল মানেই দেশের অর্থনৈতিক চাকা থমকে যাওয়া। দ্রুত সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান না হলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ: চেয়ারম্যান : গোলাম কিবরিয়া, ব্যবস্থাপনাপরিচালক : ফয়সাল শিকদার, বার্তা সম্পাদক : ইয়াছমিন আক্তার, ঠিকানা : চৌধুরী সুপার মার্কেট, এস এ গনি রোড, বারেশ্বর চৌমুনি, বুড়িচং, কুমিল্লা।
মোবাইল : +৮৮ ০১৮০৬৬০৮৫৩৩, +৮৮ ০১৯৪৮৭২৭৫৬১ , +৮৮ ০১৬৪১৬৯০৮১৬ -০১৮৬৮২৩৫১৬১
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত