
নিজস্ব প্রতিনিধি চট্টগ্রাম সিএমপির ১৬ থানায় একই ওসি সিন্ডিকেট বদলির নামে চলছে ওপেন সিক্রেট পোস্টিং বাণিজ্য, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অধীনে থাকা মোট ষোলোটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি পদে বারবার রদবদল নিয়ে সম্প্রতি চরম ক্ষোভ এবং সমালোচনা তৈরি হয়েছে কারণ দেখা যাচ্ছে দায়িত্ব পাচ্ছেন ঘুরেফিরে সেই একই সুবিধাভোগী কর্মকর্তারা এবং এই ঘটনায় রীতিমতো তোলপাড় চলছে পুলিশ প্রশাসনসহ সাধারণ জনমনে। বিভিন্ন বিতর্ক অনিয়ম ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিভাগীয় তদন্তের ভারী বোঝা মাথায় নিয়েও অনেক ওসি আবারও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক থানার দায়িত্বে বহাল তবিয়তে বসে যাচ্ছেন অন্যদিকে অত্যন্ত দক্ষ সৎ ও সিনিয়র পরিদর্শকদের একটি বিরাট অংশকে বছরের পর বছর ফেলে রাখা হয়েছে নগর গোয়েন্দা শাখা ডিবি সিটিএসবি পিবিআই ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের মতো বিভাগগুলোতে যা বর্তমান বদলি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। মূলত এই বদলির আড়ালে কী ধরণের খেলা চলছে তা নিয়ে সচেতন মহলে ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে।
সম্প্রতি ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর সদ্য বিদায়ী সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ স্বাক্ষরিত এক আদেশে নগরের ষোলোটি থানার ওসি পদে ব্যাপক রদবদল আনা হয় এবং এই আদেশে দেখা যায় পুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার কোতোয়ালি থানার ওসি মো আব্দুল করিমকে পাঁচলাইশ থানায় বদলি করা হয়েছে এবং কোতোয়ালি থানার নতুন ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাকলিয়া থানার ওসি মো আফতাব উদ্দিনকে। এছাড়া পাঁচলাইশ থানার ওসি মোহাম্মদ সোলাইমানকে বাকলিয়া থানায় সদরঘাট থানার ওসি মো আব্দুর রহিমকে বন্দর থানায় বায়েজিদ থানার ওসি জসিম উদ্দিনকে চান্দগাঁও থানায় চান্দগাঁও থানার ওসি মো জাহেদুল কবিরকে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় খুলশী থানার ওসি শাহীনুর আলমকে কর্ণফুলী থানায় ডবলমুরিং থানার ওসি মো বাবুল আজাদকে চকবাজার থানায় হালিশহর থানার ওসি মুহাম্মদ নুরুল আবছারকে পাহাড়তলী থানায় এবং কর্ণফুলী থানার ওসি মো জাহেদুল ইসলামকে খুলশী থানায় পদায়ন করা হয়েছে।
একইভাবে বন্দর থানার ওসি মোস্তফা আহম্মেদকে পতেঙ্গা থানায় পতেঙ্গার ওসি কাজী মুহাম্মদ সুলতান আহসান উদ্দীনকে হালিশহর থানায় ইপিজেড থানার ওসি কামরুজ্জামানকে আকবরশাহ থানায় এবং চকবাজার থানার ওসি শফিকুল ইসলামকে পুলিশের বিশেষ শাখা সিটিএসবিতে বদলি করা হয়। এসব বিষয়ে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হলে নগর পুলিশের মুখপাত্র ও সহকারী পুলিশ কমিশনার আমিনুর রশীদ তখন দাবি করেছিলেন যে লটারির মাধ্যমে থানাগুলোর ওসি পদে এই রদবদল আনা হয়েছে অথচ পরবর্তীতে অনুসন্ধানে জানা যায় যে বাস্তবে এই ধরণের কোনো লটারির অস্তিত্বই ছিল না বরং পর্দার আড়ালে চলেছে তীব্র তদবির ও আর্থিক লেনদেনের নানা খেলা।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায় যে গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের পর সিএমপির ষোলোটি থানার ওসি পদে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হলেও এই রদবদল প্রক্রিয়ার সর্বশেষ আদেশে দেখা যায় রদবদল হওয়া কর্মকর্তাদের অনেকে গত দেড় বছরে সিএমপির তিন চারটি থানায় ঘুরেফিরে দায়িত্ব পালন করেছেন যাদের মধ্যে পরিদর্শক বাবুল আজাদ আব্দুল করিম আরিফুর রহমান আফতাব উদ্দিনসহ আরও কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা রয়েছেন। অভ্যুত্থানের আগে সিএমপির চারটি জোনের ষোলোটি থানার ওসি হিসেবে যারা দায়িত্বে ছিলেন তাদের সবাইকে সরানো হয়েছিল অভ্যুত্থানের পরপরই এবং গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জারি করা আদেশে সিএমপির তেরোটি থানার ওসি বদলি করা হয় এবং ১০ সেপ্টেম্বর আরেক আদেশে নগর পুলিশের তেরো জন উপকমিশনার ডিসি এবং দুইজন ওসি পদে রদবদল করা হয়। সেই একই মাসে আরও তিনটি থানার ওসি পদে রদবদল করা হয়েছিল।
গত আগস্টে অভ্যুত্থানের পর গত ষোলো মাসে সিএমপির ষোলোটি থানার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত পরিদর্শক ছিলেন বাবুল আজাদ যিনি অভ্যুত্থানের আগে সিএমপির গোয়েন্দা বিভাগে কর্মরত ছিলেন এবং অভ্যুত্থানের পর তিনি নগরের পাহাড়তলী থানায় ওসি হিসেবে প্রথম পদায়ন পান কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের মাথায় তিনি সিএমপির ডবলমুরিং থানার ওসি হন এবং সর্বশেষ তাকে নগরের চকবাজার থানার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই বাবুল আজাদের বিরুদ্ধে গত অক্টোবরে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চুরির ঘটনায় মামলা না নিয়ে উল্টো মামলা করতে যাওয়া ব্যক্তিকে আটকে রেখে পঞ্চাশ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এবং বর্তমানে পুলিশ সদর দপ্তর এই অভিযোগ তদন্ত করছে এছাড়া কিছুদিন আগে আক্কাস জুয়েল নামে এক নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের কর্মীকে গ্রেপ্তারের পর থানায় এনে মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে উঠেছে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের বিদায়ী কমিশনার হাসিব আজিজ নিজের বদলির আদেশ পাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে তিন থানার ওসিসহ সাত জন পরিদর্শকের পদে রদবদলের তড়িঘড়ি আদেশ দেন যেখানে পাঁচলাইশ থানার ওসি আবদুল করিমকে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় বদলি করে সেই থানার ওসি মো জাহেদুল কবিরকে নগর বিশেষ শাখা সিটিএসবিতে পাঠানো হয়। পাশাপাশি খুলশী থানার ওসি মো জাহেদুল ইসলামকে পাঁচলাইশ থানায় এবং সিএমপির লাইনওয়ারে সংযুক্ত থাকা মো আরিফুর রহমানকে খুলশী থানার ওসির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং লাইনওয়ারে সংযুক্ত থাকা মোহাম্মদ আমির হোসেন জিয়াকে গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগে জসিম উদ্দিনকে দক্ষিণ বিভাগে এবং শহর ও যানবাহন পরিদর্শক সাইফুর রহমানকে টিআই সিটি গেইটে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর আগে নির্বাচনের প্রাক্কালে ৬ ডিসেম্বর সিএমপির সব থানার ওসি পদে রদবদল করা হয়েছিল এবং তখন আরিফুর রহমানকে আকবরশাহ থানা থেকে সদরঘাট থানায় জসিম উদ্দিনকে বায়েজিদ বোস্তামী থানা থেকে চান্দগাঁও থানায় এবং জামির হোসেন জিয়াকে পাহাড়তলী থানা থেকে ডবলমুরিং থানায় বদলি করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে ৩১ ডিসেম্বর পুলিশ সদর দপ্তরের আদেশে আরিফুর জসীম উদ্দিন ও জামির হোসেনকে থানা থেকে সরিয়ে লাইনওয়ারে সংযুক্ত করা হয়েছিল এবং সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজকে গত ১৬ মার্চ সিএমপি থেকে সরিয়ে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন এপিবিএন এর প্রধান হিসেবে বদলি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তবে কর্মস্থল ত্যাগের ঠিক প্রাক্কালে তিনি যেভাবে ওসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদলের আদেশ দিয়েছেন তা পুলিশের অভ্যন্তরীণ মহলে ব্যাপক কানাঘুষা ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। গত বিশ মাসে একাধিকবার এই ধরণের ঘন ঘন বদলির ঘটনায় পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে নানা প্রশ্ন উঠেছে এবং এসব বদলির আদেশ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে একই ধরণের কর্মকর্তা বারবার ঘুরেফিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় থানাগুলোতে দায়িত্ব পাচ্ছেন যা এই বদলির পেছনের আসল খেলা ও অদৃশ্য তদবির বা বাণিজ্যের ইঙ্গিত দেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানিয়েছেন যে থানায় দায়িত্ব নিয়ে স্থানীয় অপরাধ চক্রের গতিবিধি জানা সামাজিক বাস্তবতা এবং গোয়েন্দা তথ্য বুঝে উঠতেই একজন ওসির অনেকটা সময় লাগে সেখানে কয়েক মাস পরপর বদলি করা হলে কার্যকর ও জনবান্ধব পুলিশিং কখনোই সম্ভব হয় না, যার ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির বদলে এক ধরণের চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং যেসব থানাকে আর্থিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় সেগুলোতে একই কর্মকর্তাদের বারবার ঘুরেফিরে পদায়ন করা হলে স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক।
যদি বদলি প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট নীতিমালা ও জবাবদিহির আওতায় না আনা হয় তবে সাধারণ জনগণের মধ্যে পুলিশের প্রতি আস্থার বিরাট ঘাটতি তৈরি হতে পারে তাই ওসি পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট ও লিখিত নীতিমালা অনুসরণ করা এবং তা সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করার দাবি এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বারবার একই ওসিদের বিভিন্ন থানায় বদলির বিষয়টি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সিএমপির ষোলোটি থানায় ঘুরেফিরে এরাই রাজত্ব করছেন এবং এদের বলয়ের বাইরে অন্য কোনো চৌকস পুলিশ কর্মকর্তা সহজে সিএমপির শীর্ষ চেয়ারে বসতে পারছেন না যেমন বাকলিয়া থানার বর্তমান ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পরে পাঁচলাইশ থানায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বর্তমানে তিনি বাকলিয়া থানার দায়িত্ব নিয়েছেন অথচ এর আগে তিনি তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে পটিয়া ও সীতাকুণ্ড থানায় ছিলেন এমনকি একসময় তিনি সিএমপি কর্ণফুলী থানায় এসআই হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ওদিকে বন্দর থানার বর্তমান ওসি মো আব্দুর রহিম এর আগেও সদরঘাট থানার ওসি হিসেবে একই কমিশনারের অধীনে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং আকবর শাহ থানার বর্তমান ওসি মো কামরুজ্জামান এর আগে বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি ছিলেন। খুলশী থানার বর্তমান ওসি মো আরিফুর রহমান এর আগে বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি ছিলেন তারপর আকবর শাহ তারপর সদরঘাট থানা তারপর সিটিএসবি হয়ে আবারও তিনি খুলশী থানার দায়িত্ব পেয়েছেন। কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিন সিএমপিতে এসেই চান্দগাঁও থানা তারপর বন্দর থানা এরপর বাকলিয়া থানা হয়ে বর্তমানে কোতোয়ালি থানার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং চেকপোস্টে মাদককাণ্ডের মতো একটি ঘটনায় তাকে নিয়ে নানা জলঘোলা হয়ে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।
কর্ণফুলী থানার বর্তমান ওসি মো শাহীনূর আলম এর আগে খুলশী থানার ওসি ছিলেন এবং হালিশহর থানার ওসি কাজী মুহাম্মদ সুলতান আহসান উদ্দীন এর আগে সিএমপির বন্দর থানা তারপর পতেঙ্গা থানায় দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কয়েক দিন চকবাজার থানায় কাটিয়ে বর্তমানে হালিশহর থানায় বহাল আছেন। চকবাজার থানার বর্তমান ওসি বাবুল আজাদ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কক্সবাজার চকরিয়া ও মহেশখালী হয়ে পরে সিএমপির পাহাড়তলী থানা তারপর ডবলমুরিং মডেল থানা এবং বর্তমানে আবারো চকবাজার থানায় এসেছেন যার কারণ হিসেবে অনেকেই তার শক্তিশালী রাজনৈতিক তদবিরকে দায়ী করেন কারণ তার বিরুদ্ধে পাহাড়সম অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে সদরঘাট থানার ওসি কাজী মো মাহফুজ হাসান সিদ্দিকী আগে সিএমপির অন্য থানায় তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন এবং পাঁচলাইশ মডেল থানায় বর্তমানে দায়িত্বপালনকারী মো জাহেদুল ইসলাম এর আগে সাতকানিয়া থানা হতে ক্লোজ হন এবং কিছুদিন রাঙ্গুনিয়া থানায় থাকার পর সিএমপির কর্ণফুলী ও খুলশী হয়ে আবারও পাঁচলাইশ মডেল থানায় এসেছেন। চান্দগাঁও থানার বর্তমান ওসি মো নুর হোসেন মামুন সরাসরি প্রসিকিউশন হতে থানায় এসেছেন এবং ইপিজেড থানার বর্তমান ওসি আতিকুল ইসলাম ২০২২ সালে লোহাগাড়া থানার ওসি হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করার পর ডিএসবি ডিআইও হিসেবে ছিলেন। পতেঙ্গা থানার বর্তমান ওসি মোস্তফা আহমেদ এর আগে একই কমিশনার থাকাকালে বন্দরের ওসি ছিলেন এবং পাহাড়তলী থানার বর্তমান ওসি মোহাম্মদ নুরুল আবছার একেবারে নতুন যোগদান করেছেন এবং ডবলমুরিং মডেল থানার ওসি মোঃ জামাল উদ্দিন খাঁন ও বায়েজিদ বোস্তামী থানার বর্তমান ওসি মোঃ আব্দুল করিম এর আগে বোয়ালখালী থানার ওসি ছিলেন পরে ইপিজেড থানায় দায়িত্ব পালনকালে ক্লোজড হয়ে দামপাড়ায় সংযুক্ত ছিলেন অথচ সদ্য বিদায়ী কমিশনারের আশীর্বাদে তিনি কোতোয়ালি ও পাঁচলাইশ মডেল থানা হয়ে বর্তমানে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় পদায়ন পেয়েছেন।
এক কথায় বলা যায় ঘুরেফিরে এই কয়েকজন সুবিধাবাদী কর্মকর্তাই সিএমপির ষোলোটি থানার একক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রেখেছেন এবং এদের বাইরে নতুন কোনো কর্মকর্তার পক্ষে ওসি হওয়া প্রায় অসম্ভব কারণ এখানকার তদবির আর লবিং অত্যন্ত শক্ত এবং অনেকে এক কমিশনারের আমলে পাঁচ চারটি থানা ঘুরছেন কিন্তু দক্ষ কর্মকর্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
সিএমপিতে ওসি হতে গেলে রাজনৈতিক লবিং ও নানা প্রভাবশালীর তদবিরের ধাক্কা লাগে নয়তো ওসি হওয়া স্বপ্নের মতো ব্যাপার অথচ সিটিএসবি ডিবি পিবিআই ও কাউন্টার টেররিজমে কর্মরত অনেক চৌকস ও দক্ষ পরিদর্শকের দিকে সদ্য বিদায়ী কমিশনারের নজর কখনোই পড়েনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা পুলিশের ভেতরে যে বড় ধরণের প্রশাসনিক পুনর্গঠন শুরু হয়েছিল তার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এই ওসির পদ এবং সেই প্রক্রিয়ায় ৯ সেপ্টেম্বর একযোগে ত্রিশ জন পরিদর্শককে বদলি করা হয় যার মধ্যে তেরো জন ছিলেন সিএমপির ওসি ও জেলার অন্তত বারোটি থানার ওসি।
এই সিদ্ধান্তের পর ১০ ১২ ১৫ ও ২২ সেপ্টেম্বর একাধিক দফায় নতুন ওসি পদায়ন করা হয় যেখানে বাকলিয়া বন্দর সদরঘাট কোতোয়ালি খুলশী হালিশহর চান্দগাঁও চকবাজার কর্ণফুলী পাঁচলাইশ ও ইপিজেড থানায় নতুন মুখ আনা হয় কিন্তু এই নতুন মুখদের বড় অংশই ছিলেন একই ঘুণে ধরা সিস্টেমের ভেতরের কর্মকর্তা এবং ফলে বাইরে থেকে কোনো নতুন নেতৃত্ব আসেনি বরং অভ্যন্তরীণ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যেই ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়েছে। পরবর্তীতে গত বছরের ২২ অক্টোবর চট্টগ্রামের চার থানায় ওসি রদবদল হয় এবং বদলির ধরণটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এটি মূলত পছন্দের পোস্টিং পাওয়ার এক অদৃশ্য বাণিজ্য এবং এর ফলে সাধারণ মানুষের স্বার্থের চেয়ে ওসির ব্যক্তিগত আখের গোছানোর পথ সুগম হচ্ছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে লটারির যে দাবি করা হয়েছিল তার কোনো ভিত্তি ছিল না এবং সদ্য বিদায়ী কমিশনারের মেয়াদে ওসির এই বদলি নিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক বা সুজনের চট্টগ্রাম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে একই কর্মকর্তাদের বারবার গুরুত্বপূর্ণ থানায় বসানো হলে পুলিশের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই এবং বদলি যদি সুনির্দিষ্ট স্বচ্ছ নীতিমালা অনুযায়ী না হয় তবে জনগণের পুলিশের প্রতি আস্থার জায়গাটি ধসে পড়বে।
এছাড়া বাংলাদেশের প্রচলিত আইনি বিধিবিধান যেমন পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল ১৯৪৩ বা পিআরবি এবং ক্রিমিনাল প্রসিডিওর কোড ১৮৯৮ এর আলোকে থানার ওসির দায়িত্ব বণ্টন ও কার্যক্রমে পেশাদারিত্ব নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে এবং সাধারণভাবে একটি থানায় দুই থেকে তিন বছর দায়িত্ব পালনের একটি প্রশাসনিক রীতি থাকলেও চট্টগ্রামে কয়েক মাস পরপর বদলি করা হচ্ছে যা পিআরবি এর ৩৭৬ বি ধারার সরাসরি পরিপন্থী। সিআরপিসির ১৫৪ ও ১৫৫ ধারা মামলা গ্রহণ ও তদন্তের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্ধারণ করে দেয় কিন্তু বারবার ওসি বদলির কারণে মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতা থাকে না যা চূড়ান্তভাবে বিচার প্রক্রিয়াকে পঙ্গু ও দুর্বল করে তোলে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের বর্তমান চিত্র প্রমাণ করে যে বদলি প্রক্রিয়াটি নীতি নির্ভর না হয়ে ব্যক্তি নির্ভর ও তদবির নির্ভর হয়ে পড়েছে যা জননিরাপত্তা রক্ষা ও অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে বড় বাঁধা এবং এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে সুনির্দিষ্ট লিখিত ও জবাবদিহিমূলক বদলি নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে এবং দুর্নীতি চাঁদাবাজি ও নির্যাতনের দায়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে অন্যথায় চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে যা কারো কাম্য নয়।




















