এনভয় গ্রুপ ও শেলটেকের প্রতিষ্ঠাতা কুতুবউদ্দিন আহমেদ এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, অবৈধ সম্পদ অর্জন, কালোটাকা সাদা করা ও হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের গুরুতর অভিযোগের অনুসন্ধান রহস্যজনকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে অভিযোগকারী মৃত্যুবরণ করায় অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে, শেলটেকের এমন বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দুদকের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কুতুবউদ্দিন আহমেদ, তার স্ত্রী রাশিদা আহমেদ, ছেলে তানভীর আহমেদ এবং মেয়ে সুমাইয়া আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার ও বিদেশে বিনিয়োগ সংক্রান্ত অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক অনুসন্ধান শুরু করেছিল। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেনের তথ্যও তলব করা হয়েছিল। কিন্তু একপর্যায়ে সেই অনুসন্ধান আর এগোয়নি এবং পরবর্তীতে অভিযোগ নিষ্পত্তি দেখানো হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেলটেক গ্রুপের জনসংযোগ কর্মকর্তা পরিচয়দানকারী তানিম বলেন, “অভিযোগটি একজন মৃত ব্যক্তি করেছিলেন। অভিযোগকারী মৃত্যুবরণ করায় বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয় এবং অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।”
তবে প্রশ্ন উঠেছে, দুর্নীতি, অর্থপাচার কিংবা অবৈধ সম্পদের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অভিযোগে অভিযোগকারীর মৃত্যু কি অনুসন্ধান বন্ধ করার বৈধ কারণ হতে পারে?
দুদকের সাবেক ও বর্তমান একাধিক কর্মকর্তার মতে, দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয় নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট একটি প্রক্রিয়া। অভিযোগকারী মারা গেলেও অভিযোগে যদি দুর্নীতির উপাদান থাকে, তাহলে কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়েও অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট অভিযোগ ব্যবস্থাপনায় অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি। অনেক ক্ষেত্রে হুইসেলব্লোয়ার বা তথ্যদাতার নিরাপত্তার স্বার্থে তার পরিচয় প্রকাশ না করার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। ফলে শুধুমাত্র অভিযোগকারীর মৃত্যুকে ভিত্তি করে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ নিষ্পত্তি করার যুক্তি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যদি অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু হয়ে থাকে এবং ব্যাংক হিসাবসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলমান থাকে, তাহলে অভিযোগকারীর মৃত্যুর কারণে অনুসন্ধান বন্ধ করার বিষয়টি স্বাভাবিক নয়। অনুসন্ধান শেষ হবে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে, অভিযোগকারীর জীবিত বা মৃত থাকার ভিত্তিতে নয়।”
দুদক সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কুতুবউদ্দিন আহমেদ ও তার পরিবারের ব্যাংক হিসাব, আর্থিক লেনদেন এবং সম্পদের তথ্য সংগ্রহে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তথ্য জমা দিতেও বলা হয়েছিল।
অভিযোগে বলা হয়েছিল, আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ, প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দেখিয়ে ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক স্পেস হস্তান্তর, কালোটাকা বৈধকরণ এবং বিদেশে অর্থপাচারের মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এসব অভিযোগের কিছু প্রাথমিক তথ্যও সংগ্রহ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে অনুসন্ধানের অগ্রগতি থেমে যায়।
এ বিষয়ে দুদকের (অনুসন্ধান ও তদন্ত) বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না শর্তে বলেন, “এনভয় গ্রুপের অভিযোগের বিষয়ে যদি কেউ পুনঃতদন্তের আবেদন করেন, তাহলে কমিশন বিষয়টি পর্যালোচনা করে পুনরায় তদন্ত করতে পারে।”
দুদকের এই বক্তব্যের পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—যদি পুনঃতদন্তের সুযোগ থেকেই থাকে, তাহলে অতীতে কী কারণে অনুসন্ধানটি বন্ধ করা হয়েছিল? অভিযোগকারী মৃত্যুবরণ করাই যদি একমাত্র কারণ হয়ে থাকে, তবে তা কতটা আইনসম্মত ছিল?
সুশীল সমাজ ও দুর্নীতিবিরোধী কর্মীরা বলছেন, বিষয়টি শুধু একজন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দুদকের অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। তাদের মতে, কুতুবউদ্দিন ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো পুনরায় নিরপেক্ষভাবে তদন্তের পাশাপাশি অতীতের অনুসন্ধান কেন থেমে গিয়েছিল, কারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং কোন ভিত্তিতে অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছিল, সেটিও প্রকাশ্যে আনা উচিত।
তাদের ভাষায়, “অভিযোগকারী মারা গেছেন কি না, সেটি মুখ্য নয়; মুখ্য হলো অভিযোগে দুর্নীতির সত্যতা ছিল কি না। যদি অভিযোগে উপাদান থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তা অনুসন্ধান করা। অন্যথায় দুর্নীতিবিরোধী লড়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।”
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ: চেয়ারম্যান : গোলাম কিবরিয়া, ব্যবস্থাপনাপরিচালক : ফয়সাল শিকদার, বার্তা সম্পাদক : ইয়াছমিন আক্তার, ঠিকানা : চৌধুরী সুপার মার্কেট, এস এ গনি রোড, বারেশ্বর চৌমুনি, বুড়িচং, কুমিল্লা।
মোবাইল : +৮৮ ০১৮০৬৬০৮৫৩৩, +৮৮ ০১৯৪৮৭২৭৫৬১ , +৮৮ ০১৬৪১৬৯০৮১৬ -০১৮৬৮২৩৫১৬১
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত