আমাদের সময়ে কোনো শিক্ষককে সাইকেল চালিয়ে আসতে দেখলে আমরা রাস্তা থেকে ভো-দৌড়ে বাঁশঝাঁড়ে ঢুকে পড়তাম। স্যারকে যতক্ষণ দেখা যেত, ততক্ষণ বেরই হতাম না। শিক্ষকরা শুধু ক্লাস নিতেন না—রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিতেন, কে পড়ছে, কে পড়ছে না। সম্পর্কটা ছিল শিক্ষক-শিক্ষার্থীর চেয়ে বেশি—অভিভাবক ও সন্তানের মতো।
কিন্তু সময় বদলেছে। এখনকার প্রজন্ম বড় হচ্ছে ভিন্ন এক বাস্তবতায়—প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুতগতির, এআই-চালিত পৃথিবীতে। শিক্ষা এখন আর শুধু শ্রেণিকক্ষ বা বই-খাতার পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; তা ছড়িয়ে গেছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পর্কও হয়ে গেছে বন্ধুর মতো।
নাইট ডিউটিতে বের হলে মাঝেমধ্যে দেখি—রাস্তার পাশে তরুণ-কিশোরদের ঝাঁক। সবাই একসাথে বসে আছে, অথচ কেউ কারও সঙ্গে কথা বলছে না। সবার চোখ স্থির মোবাইলের স্ক্রিনে। জিজ্ঞেস করলে বলে, “অনলাইন ক্লাস করি।” কিন্তু মোবাইল চেক করলে দেখা যায়—অনলাইন জুয়া, ভিডিও গেম কিংবা আরও অনাকাঙ্ক্ষিত কনটেন্টে নিমগ্ন।
সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের সন্ধ্যার পর বাইরে থাকা নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনে পুলিশি তল্লাশির কথাও উঠেছে। উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ভালো। তবে আমার মনে হয়, এভাবে পুলিশ দিয়ে শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরানো ভুল অ্যাপ্রোচ। বর্তমান দুনিয়ায় এতে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
আমি কোনোভাবেই কিশোরদের রাতের বেলা বাইরে টাইম পাসের পক্ষপাতী নই। কিন্তু পুলিশ দিয়ে যে অ্যাপ্রোচে তাদের ঘরে ফেরাতে বলা হচ্ছে, সেটা বাড়াবাড়ি এবং অত্যন্ত কঠোর কৌশল।
এই ছেলেপিলেগুলোকে ঘরে ফেরত পাঠালেই কি তারা পড়ার টেবিলে বই-খাতা নিয়ে বসবে? ওদের হাতে হাতে স্মার্টফোন। সারা দুনিয়ার সঙ্গে ওরা কানেক্টেড। টাইম পাসের জন্য ওদের কি গলির মোড়ে, চিপাচাপায় আর উদ্যানে বসে থাকা লাগবে?
বর্তমান আধুনিক এআই প্রযুক্তির আদলে বেড়ে ওঠা আমাদের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার টেবিলে ফেরাতে হলে ২০০১–২০০৫ সালের মাইন্ডসেট পরিবর্তন করতে হবে। ২০২৬ সালে এসে হেলিকপ্টারে উড়ে নকল প্রতিরোধের কৌশল এখন ব্যাকডেটেড। কারণ এখন পোলাপান পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন হাতে পেয়ে যায়। পরীক্ষার হলে এখন আর নকল করে না; কারণ কানের ভেতরে লাগানো থাকে অতি ক্ষুদ্র যন্ত্র। সানগ্লাস, এমনকি কলমের ভেতরেও ক্যামেরা থাকে, যার মাধ্যমে পুরো বই কপি করে নিয়ে যাওয়া যায়।
তাই কিশোরদের পড়ার টেবিলে ফেরাতে হলে প্রথমেই পরীক্ষাপদ্ধতিতে কড়াকড়ি আরোপ করতে হবে। প্রশ্নপত্রের মান বাড়াতে হবে। সবচেয়ে বেশি জরুরি প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা রক্ষা করা—যাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস না হয়। প্রশ্ন ফাঁস হলে পরীক্ষার হলের কড়াকড়ি অর্থহীন হয়ে যায়। ভালো এবং মানসম্মত প্রশ্নপত্র হলে, যারা সত্যিকারভাবে পড়াশোনা করে, তারাই উতরে যাবে। যারা বাইরে, উদ্যানে, রাতবিরাতে ঘুরে ঘুরে টাইম পাস করে, তারা নিশ্চিতভাবেই ধরা খাবে।
এই ধরা খাওয়াটাই তাদের টেবিলে টেনে আনবে।
সাথে স্কুল-কলেজে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের যোগ্যতা বাড়াতে আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। অধিক মেধাবীদের শিক্ষক পেশায় নিয়ে আসতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ শতভাগ ফেয়ার করতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেলে সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে।
রাতবিরাতে ঘুরাঘুরি থেকে বিরত রাখতে হলে দরকার যুগোপযোগী পদক্ষেপ, কাউন্সেলিং এবং বন্ধুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল আচরণ। এসব না করে পুলিশ দিয়ে তল্লাশি, চড়-থাপ্পড় বা লাঠিচার্জ করে হয়তো সাময়িকভাবে রাস্তাঘাট ফাঁকা করা যাবে; কিন্তু পড়ার টেবিলে ফেরানো তো দূরের কথা, ঘরে ফেরানোটাও দায় হয়ে যাবে।
এরা কিন্তু এআই জেনারেশন।
মোঃ মেহেদী হাসান জুয়েল
এসআই, বাংলাদেশ পুলিশ।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ: চেয়ারম্যান : গোলাম কিবরিয়া, ব্যবস্থাপনাপরিচালক : ফয়সাল শিকদার, বার্তা সম্পাদক : ইয়াছমিন আক্তার, ঠিকানা : চৌধুরী সুপার মার্কেট, এস এ গনি রোড, বারেশ্বর চৌমুনি, বুড়িচং, কুমিল্লা।
মোবাইল : +৮৮ ০১৮০৬৬০৮৫৩৩, +৮৮ ০১৯৪৮৭২৭৫৬১ , +৮৮ ০১৬৪১৬৯০৮১৬
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত