
সাইফুল কসবা, ব্রাহ্মনবাড়িয়া
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক জলাধার দখল ও ভরাটের ঘটনায় স্থানীয় পরিবেশ এবং কৃষি অর্থনীতিতে মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ভূমি রেকর্ড অনুযায়ী, কসবা পৌরসভার অন্তর্গত তালতলা মৌজার ৯৮২ নম্বর দাগে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি খাল অবৈধভাবে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে মাটি ফেলে ভরাট করে ফেলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বর্ষা ও মৌসুমি বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে ব্যবহৃত এই সরকারি জলাধারটির ভরাট করে প্রাকৃতিক প্রবাহ রুদ্ধ করার তৎপরতা চলছে বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
সরেজমিন ও স্থানীয়দের অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ভরাট করা এই সরকারি জায়গাটি ঘিরে একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহলের তৎপরতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, পরিবেশ ও আইন উপেক্ষা করে ভরাটকৃত উক্ত জায়গা শতক প্রতি প্রায় ২০ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা দরে বিক্রির গোপন চুক্তি ও বাণিজ্যিক পাঁয়তারা চলছে। প্রচলিত আইন অনুযায়ী যেকোনো ধরনের সরকারি জলাশয় কিংবা প্রাকৃতিক খালের শ্রেণি পরিবর্তন বা ভরাট করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তা সত্ত্বেও চড়া মূল্যে বাণিজ্যিক প্লট হিসেবে বিক্রির উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় এই সম্পদ দখলের অভিযোগ দিন দিন জোরালো হচ্ছে।
একই মৌজায় দখলদারিত্বের এই বিস্তার কেবল একটি নির্দিষ্ট অংশেই সীমাবদ্ধ নেই।এছাড়াও সংলগ্ন তালতলা বটগাছের নিচে অবস্থিত ৯৮০ নম্বর দাগের পশ্চিম দিকের ব্রিজের পাশের সরকারি শাখা খালটিও মাটি ফেলে ভরাট করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই শাখা খালটি পার্শ্ববর্তী বিস্তীর্ণ কৃষিজমির পানি নিষ্কাশনের প্রধান প্রাকৃতিক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্যমতে, ব্রিজের পাশের এই শাখা খালটির মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই সংলগ্ন ফসলি জমিগুলোতে ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। জমিতে জমে থাকা পানি নামতে না পেরে বীজতলা ও মৌসুমভিত্তিক ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে, যা এলাকার কৃষি উৎপাদন ও কৃষকদের জীবন-জীবিকাকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
জনগুরুত্বপূর্ণ এই দুটি সরকারি খাল ভরাটের ঘটনা প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটলেও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসনের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা তদারকি চোখে পড়ছে না। প্রকাশ্য ড্রেজিং ও ভরাটের বিষয়ে অভিযোগ উঠলেও কর্তৃপক্ষের এমন নিষ্ক্রিয় ও নীরব ভূমিকা জনমনে গভীর ক্ষোভ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় সচেতন সমাজের অভিযোগ, এই দখল প্রক্রিয়ার নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক সিন্ডিকেট এবং কিছু প্রভাবশালী সরকারি আমলার পরোক্ষ যোগসাজশ। অভিযোগকারীদের দাবি, এই প্রভাবশালী বলয়ের প্রভাব ও অদৃশ্য চাপের কারণেই স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে, যার সুযোগে খালটির অস্তিত্ব কার্যত বিপন্ন হতে চলেছে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন এবং উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা অনুসারে খালের স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন বা ভরাট করা দণ্ডনীয় অপরাধ। একটি পৌর এলাকার প্রাণকেন্দ্রে এভাবে শাখা খাল ও মূল খাল ভরাট হতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে তা কেবল কৃষিতেই নয়, পুরো কসবা পৌরসভার পরিবেশগত ভারসাম্যের ওপর মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
স্থানীয় সচেতন মহল ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, কোনো ধরনের প্রভাব বা রক্তচক্ষুর কাছে নতি স্বীকার না করে জনস্বার্থে প্রশাসনের এই নীরবতা ভাঙতে হবে। অবিলম্বে ৯৮০ ও ৯৮২ নম্বর দাগের খালের সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ ভরাট বন্ধ করা, দখলমুক্ত করা এবং কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি আইনি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।




















