০৬:৩১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

অনলাইন জুয়া ও অর্থপাচার চক্রের তিন সদস্য গ্রেফতার

  • প্রকাশের সময় : ১১:৩৯:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
  • 36

অনলাইন বেটিং বা জুয়া পরিচালনা এবং অবৈধ ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিদেশে পাচারের অভিযোগে সংঘবদ্ধ চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

গত ৬ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে পাবনা জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেন—মো. মনোয়ার হোসেন (৪১), মো. মারুফ হোসেন হলি (২৭) এবং মো. ইলিয়াস হোসেন রাজু (২৬)। তাঁদের কাছ থেকে আলামত হিসেবে মোবাইল ফোন ও সিম উদ্ধার করা হয়েছে।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে পাবনা জেলার আতাইকুলা থানার বনগ্রাম বাজার এলাকা থেকে ইলিয়াস হোসেন রাজুকে গ্রেফতার করা হয়। পরে রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে সাঁথিয়া থানার কাশিনাথপুর বাজার এলাকা থেকে মনোয়ার হোসেন ও মারুফ হোসেন হলিকে গ্রেফতার করা হয়।

যেভাবে পরিচালিত হতো অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, সাইবার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে অবস্থানকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্রের অনলাইন বেটিং ও জুয়ার ওয়েবসাইট পরিচালনার তথ্য পায় সিআইডি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপন প্রচার করা হতো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাকে কেন্দ্র করে অর্থের বিনিময়ে অনলাইন বেটিংয়ের আয়োজন করা হতো।

এসব সাইটে অংশ নিতে ব্যবহারকারীদের প্রথমে টাকা জমা দিতে হতো। এ জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ব্যাংক হিসাব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হতো। টাকা জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বেটিং অ্যাকাউন্টে সমপরিমাণ ই-মানি যুক্ত করা হতো, যা দিয়ে ব্যবহারকারীরা জুয়ায় অংশ নিতেন।

এ ঘটনায় সিআইডি বাদী হয়ে ১৯ মে ২০২৬ তারিখে পল্টন থানায় মামলা করে। মামলাটির নম্বর ২৪। এজাহারে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২০(২), ২১(২), ২৪(২) ও ২৭(২) ধারা উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যাংক হিসাব ও এমএফএস এজেন্ট নম্বর ব্যবহার

প্রাথমিক তদন্তে সিআইডি জানতে পারে, বেটিং সাইটগুলোতে টাকা জমা ও উত্তোলনের জন্য বিভিন্ন এমএফএস এজেন্ট নম্বর এবং ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করা হতো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে এসব নম্বর ও হিসাব নিয়মিত পরিবর্তন করা হতো বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

চক্রটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এজেন্ট নিয়োগ করে তাঁদের মাধ্যমে একাধিক এমএফএস এজেন্ট নম্বর ও ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করত। পরে টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে এসব হিসাবের তথ্য বেটিং সাইট পরিচালনাকারীদের কাছে পাঠানো হতো।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ এজেন্টরা একত্রিত করে কমিশন রেখে অবশিষ্ট অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করতেন। পরে ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্থ বিদেশে পাচার করা হতো বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার দাবি

সিআইডি জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের (পিএসডি) ২৮ মে ২০২৫ তারিখের সার্কুলার নম্বর ০৭ অনুযায়ী অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম বন্ধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে অভিযোগ রয়েছে, সংঘবদ্ধ চক্রটি এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করে অবৈধ অনলাইন বেটিং ও আর্থিক লেনদেন চালিয়ে আসছিল।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা অনলাইন বেটিং চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং জুয়ার টাকা সংগ্রহের বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে সিআইডি। তবে চক্রের অন্য সদস্যদের পরিচয়, জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ এবং অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি ব্যক্তি ও নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে তাঁদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

তদন্ত অব্যাহত, জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান

মামলাটির সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে অনলাইন বেটিংয়ের সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি ব্যক্তি ও চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করা, অবৈধ লেনদেন ও অর্থপাচারের প্রকৃত পরিমাণ এবং পদ্ধতি উদ্‌ঘাটনসহ জড়িত অন্যদের গ্রেফতারে সিআইডির কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

একই সঙ্গে অনলাইন জুয়া ও বেটিং থেকে বিরত থাকার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। কোনো ব্যক্তি বা চক্রের মাধ্যমে অনলাইন বেটিংয়ের নামে অর্থ লেনদেন না করা এবং এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।

জনপ্রিয়

অনলাইন জুয়া ও অর্থপাচার চক্রের তিন সদস্য গ্রেফতার

প্রকাশের সময় : ১১:৩৯:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬

অনলাইন বেটিং বা জুয়া পরিচালনা এবং অবৈধ ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিদেশে পাচারের অভিযোগে সংঘবদ্ধ চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

গত ৬ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে পাবনা জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেন—মো. মনোয়ার হোসেন (৪১), মো. মারুফ হোসেন হলি (২৭) এবং মো. ইলিয়াস হোসেন রাজু (২৬)। তাঁদের কাছ থেকে আলামত হিসেবে মোবাইল ফোন ও সিম উদ্ধার করা হয়েছে।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে পাবনা জেলার আতাইকুলা থানার বনগ্রাম বাজার এলাকা থেকে ইলিয়াস হোসেন রাজুকে গ্রেফতার করা হয়। পরে রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে সাঁথিয়া থানার কাশিনাথপুর বাজার এলাকা থেকে মনোয়ার হোসেন ও মারুফ হোসেন হলিকে গ্রেফতার করা হয়।

যেভাবে পরিচালিত হতো অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, সাইবার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে অবস্থানকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্রের অনলাইন বেটিং ও জুয়ার ওয়েবসাইট পরিচালনার তথ্য পায় সিআইডি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এসব ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপন প্রচার করা হতো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাকে কেন্দ্র করে অর্থের বিনিময়ে অনলাইন বেটিংয়ের আয়োজন করা হতো।

এসব সাইটে অংশ নিতে ব্যবহারকারীদের প্রথমে টাকা জমা দিতে হতো। এ জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ব্যাংক হিসাব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হতো। টাকা জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বেটিং অ্যাকাউন্টে সমপরিমাণ ই-মানি যুক্ত করা হতো, যা দিয়ে ব্যবহারকারীরা জুয়ায় অংশ নিতেন।

এ ঘটনায় সিআইডি বাদী হয়ে ১৯ মে ২০২৬ তারিখে পল্টন থানায় মামলা করে। মামলাটির নম্বর ২৪। এজাহারে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ২০(২), ২১(২), ২৪(২) ও ২৭(২) ধারা উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যাংক হিসাব ও এমএফএস এজেন্ট নম্বর ব্যবহার

প্রাথমিক তদন্তে সিআইডি জানতে পারে, বেটিং সাইটগুলোতে টাকা জমা ও উত্তোলনের জন্য বিভিন্ন এমএফএস এজেন্ট নম্বর এবং ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করা হতো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে এসব নম্বর ও হিসাব নিয়মিত পরিবর্তন করা হতো বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

চক্রটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এজেন্ট নিয়োগ করে তাঁদের মাধ্যমে একাধিক এমএফএস এজেন্ট নম্বর ও ব্যাংক হিসাব সংগ্রহ করত। পরে টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে এসব হিসাবের তথ্য বেটিং সাইট পরিচালনাকারীদের কাছে পাঠানো হতো।

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ এজেন্টরা একত্রিত করে কমিশন রেখে অবশিষ্ট অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করতেন। পরে ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্থ বিদেশে পাচার করা হতো বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার দাবি

সিআইডি জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের (পিএসডি) ২৮ মে ২০২৫ তারিখের সার্কুলার নম্বর ০৭ অনুযায়ী অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম বন্ধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে অভিযোগ রয়েছে, সংঘবদ্ধ চক্রটি এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করে অবৈধ অনলাইন বেটিং ও আর্থিক লেনদেন চালিয়ে আসছিল।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা অনলাইন বেটিং চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং জুয়ার টাকা সংগ্রহের বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছে সিআইডি। তবে চক্রের অন্য সদস্যদের পরিচয়, জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ এবং অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি ব্যক্তি ও নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে তাঁদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

তদন্ত অব্যাহত, জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান

মামলাটির সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে অনলাইন বেটিংয়ের সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি ব্যক্তি ও চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করা, অবৈধ লেনদেন ও অর্থপাচারের প্রকৃত পরিমাণ এবং পদ্ধতি উদ্‌ঘাটনসহ জড়িত অন্যদের গ্রেফতারে সিআইডির কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

একই সঙ্গে অনলাইন জুয়া ও বেটিং থেকে বিরত থাকার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। কোনো ব্যক্তি বা চক্রের মাধ্যমে অনলাইন বেটিংয়ের নামে অর্থ লেনদেন না করা এবং এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।