০২:৪৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

নিজেকে পরিবর্তন ও রবের সান্নিধ্যের অপার সুযোগ করে দিয়েছে মাহে রমজান

  • প্রকাশের সময় : ০৬:৪৯:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • 47

গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির

রবের সান্নিধ্য লাভের এক অপার সুযোগ ও আনন্দ মিশে আছে মাহে রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত । পবিত্র কোরআনের আলোয় আলোকিত সময় মাহে রমজান। রমজান এমন এক পাঠশালা, যেখানে প্রকৃত মুত্তাকি হওয়ার সবক দেওয়া হয় পরম যত্নে। নিজেকে রবের নিকট সঁপে দেওয়ার এক নিরন্তর সাধনা চলে এই পবিত্র সময়ে। প্রতিটি মানুষ যেন তার ভেতরের কালিমা মুছে ফেলে এক আলোকিত সত্তা হয়ে উঠতে পারে, সেই অমূল্য সুযোগ নিয়ে আসে এই মাস। রোজা রাখার সুবিধা হলো, রোজাদার বৈধ অনেক কিছু বর্জনের অভ্যাসে যখন অভ্যস্ত হন, তখন হারাম কাজ ও অভ্যাস বর্জন করা তার জন্য অনেক সহজ হয়ে যায়।
রোজাদার যেহেতু দিনে উপবাস থাকেন, তাই রমজানে মন্দ অভ্যাস/ স্বভাব দূর করার উপযুক্ত সময়। রমজানের সময় ধূমপান ও চিনিযুক্ত খাবার ভোজনের মতো মন্দ অভ্যাসগুলোকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয় এবং এসব থেকে বিরত থাকলে মানুষের শরীর ধীরে ধীরে এদের অনুপস্থিতি মেনে নিতে সক্ষম হবে এবং এক সময় এসবের আসক্তি চিরতরে দূর হয়ে যাবে। মানুষের এসব মন্দ অভ্যাস বা স্বভাব দূরে করতে রোজার তাৎপর্য এতই যে, যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস ধূমপান ত্যাগের জন্য রমজান মাসকে আদর্শ সময় হিসেবে অভিহিত করেছে। রমজান মাস ভালো অভ্যাস আয়ত্ত করারও মৌসুম। রোজার মাসে তো বটেই, বছর জুড়ে এই অভ্যাস গুলো থাকা ভালো। ওইসব অভ্যাস হতে পারে, প্রতিদিন কোরআন মাজিদ তেলাওয়াত করা, জিকির-আজকার করা, দরূদ শরীফ,নফল ইবাদতে অভ্যন্ত হওয়া। যদি নিয়ত থাকে খতম দেওয়ার, তাহলে প্রতি ওয়াক্তে পাঁচ পৃষ্ঠা করে পড়া যায়। তাহলে প্রতিদিন ২৫ পৃষ্ঠা এবং মাস শেষ হওয়ার আগেই একটি খতম হয়ে যাবে।

রমজানে তাহাজ্জুদের অভ্যাস করা উচিত। সাধারণত রোজার মাসে ঘুমাতে দেরি হয়। আবার সাহরির সময়ও দেখা যায় অনেকে আগে আগে ওঠেন। এ সময়টা কাজে লাগানো যায়। ফজরের আগমুহূর্তটা দোয়া কবুলের সময়। এ সময় তাহাজ্জুদের নামাজ পড়া যায়। প্রথমে ২ রাকাত কিংবা ৪ রাকাত নামাজ দিয়েই শুরু করা যায়।

এ মাসে সুন্নত ও নফল নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত। প্রতি ওয়াক্ত ফরজ নামাজের আগে বা পরের বেশ কিছু সুন্নত নামাজ রয়েছে। সারা বছর বিভিন্ন ব্যস্ততা বা অলসতার কারণে অনেক সময় সেগুলো নিয়মিত আদায় করা হয় না। ফরজ সেগুলো আদায়ের অভ্যাস করা। প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পর কিছু দোয়া আছে,সে দোয়া গুলো আদায় করলে জিন-শয়তান থেকে নিরাপত্তা, কাজে, কর্মে ও রিজিকে বরকত লাভ ইত্যাদি ক্ষেত্রে এই আমলগুলো বেশ কার্যকর। প্রতি ওয়াক্তে সর্বোচ্চ ১০ মিনিট লাগে এগুলো আদায় করতে। এগুলো নিয়মিত করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে সকাল-সন্ধ্যার জিকিরগুলো করা। আল্লাহর রাসুল (সা.) সকাল-সন্ধ্যার কিছু জিকির শিখিয়ে গেছেন, যেগুলো অনেক ফজিলতপূর্ণ। রোজার মাসে এগুলো অভ্যাসে পরিণত করা যায়। বিভিন্ন দোয়ার বইতে সেগুলো পাওয়া যাবে।

মনে রাখতে হবে, আখিরাত ও বিচার দিবসের প্রতি সুনিশ্চিত বিশ্বাস মানুষকে সদাসচেতন এবং সব ধরনের পাপাচার থেকে দূরে রাখার জন্য যথেষ্ট। পবিত্র কোরআনে বার বার এই দিনটির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন মহান আল্লাহ। আর আল্লাহর স্মরণ মানুষকে যাবতীয় অন্যায়-অনাচার থেকে দূরে রাখে। আল্লাহকে ভালোভাবে চিনলে ও জানলে মানুষ আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করবে। আর আল্লাহকে চেনা ও জানার ভালো উপায় হলো, নিজেকে আমলের মাঝে ডুবিয়ে রাখা।

সুরা আনফালের দ্বিতীয় আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা ইমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেওয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কালাম, তখন তাদের ইমান বেড়ে যায় এবং তারা নিজ পরওয়ারদেগারের প্রতি ভরসা পোষণ করে।’ এই আয়াতের আলোকে ভেবে দেখা উচিত, সারা দিনে আল্লাহর নাম আমরা যতবার শুনি, ততবার বা একবারও কী আমাদের মন কেঁপে ওঠে? আসলে আল্লাহকে ভালোভাবে চিনি না ও জানি না বলেই আমাদের এই অবস্থা! মহান আল্লাহ যেন আমাদেরকে আলোকিত তথা মুত্তাকি হওয়ার তওফিক দান করেন। আমিন।

লেখক: গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির, ধর্ম ও সমাজ বিশ্লেষক, ধর্মীয় গবেষক ও প্রাবন্ধিক। চেয়ারম্যান – গাউছিয়া ইসলামিক মিশন, কুমিল্লা।

জনপ্রিয়

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ-এর আয়োজনে ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত

নিজেকে পরিবর্তন ও রবের সান্নিধ্যের অপার সুযোগ করে দিয়েছে মাহে রমজান

প্রকাশের সময় : ০৬:৪৯:৩৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির

রবের সান্নিধ্য লাভের এক অপার সুযোগ ও আনন্দ মিশে আছে মাহে রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত । পবিত্র কোরআনের আলোয় আলোকিত সময় মাহে রমজান। রমজান এমন এক পাঠশালা, যেখানে প্রকৃত মুত্তাকি হওয়ার সবক দেওয়া হয় পরম যত্নে। নিজেকে রবের নিকট সঁপে দেওয়ার এক নিরন্তর সাধনা চলে এই পবিত্র সময়ে। প্রতিটি মানুষ যেন তার ভেতরের কালিমা মুছে ফেলে এক আলোকিত সত্তা হয়ে উঠতে পারে, সেই অমূল্য সুযোগ নিয়ে আসে এই মাস। রোজা রাখার সুবিধা হলো, রোজাদার বৈধ অনেক কিছু বর্জনের অভ্যাসে যখন অভ্যস্ত হন, তখন হারাম কাজ ও অভ্যাস বর্জন করা তার জন্য অনেক সহজ হয়ে যায়।
রোজাদার যেহেতু দিনে উপবাস থাকেন, তাই রমজানে মন্দ অভ্যাস/ স্বভাব দূর করার উপযুক্ত সময়। রমজানের সময় ধূমপান ও চিনিযুক্ত খাবার ভোজনের মতো মন্দ অভ্যাসগুলোকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয় এবং এসব থেকে বিরত থাকলে মানুষের শরীর ধীরে ধীরে এদের অনুপস্থিতি মেনে নিতে সক্ষম হবে এবং এক সময় এসবের আসক্তি চিরতরে দূর হয়ে যাবে। মানুষের এসব মন্দ অভ্যাস বা স্বভাব দূরে করতে রোজার তাৎপর্য এতই যে, যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস ধূমপান ত্যাগের জন্য রমজান মাসকে আদর্শ সময় হিসেবে অভিহিত করেছে। রমজান মাস ভালো অভ্যাস আয়ত্ত করারও মৌসুম। রোজার মাসে তো বটেই, বছর জুড়ে এই অভ্যাস গুলো থাকা ভালো। ওইসব অভ্যাস হতে পারে, প্রতিদিন কোরআন মাজিদ তেলাওয়াত করা, জিকির-আজকার করা, দরূদ শরীফ,নফল ইবাদতে অভ্যন্ত হওয়া। যদি নিয়ত থাকে খতম দেওয়ার, তাহলে প্রতি ওয়াক্তে পাঁচ পৃষ্ঠা করে পড়া যায়। তাহলে প্রতিদিন ২৫ পৃষ্ঠা এবং মাস শেষ হওয়ার আগেই একটি খতম হয়ে যাবে।

রমজানে তাহাজ্জুদের অভ্যাস করা উচিত। সাধারণত রোজার মাসে ঘুমাতে দেরি হয়। আবার সাহরির সময়ও দেখা যায় অনেকে আগে আগে ওঠেন। এ সময়টা কাজে লাগানো যায়। ফজরের আগমুহূর্তটা দোয়া কবুলের সময়। এ সময় তাহাজ্জুদের নামাজ পড়া যায়। প্রথমে ২ রাকাত কিংবা ৪ রাকাত নামাজ দিয়েই শুরু করা যায়।

এ মাসে সুন্নত ও নফল নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া উচিত। প্রতি ওয়াক্ত ফরজ নামাজের আগে বা পরের বেশ কিছু সুন্নত নামাজ রয়েছে। সারা বছর বিভিন্ন ব্যস্ততা বা অলসতার কারণে অনেক সময় সেগুলো নিয়মিত আদায় করা হয় না। ফরজ সেগুলো আদায়ের অভ্যাস করা। প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পর কিছু দোয়া আছে,সে দোয়া গুলো আদায় করলে জিন-শয়তান থেকে নিরাপত্তা, কাজে, কর্মে ও রিজিকে বরকত লাভ ইত্যাদি ক্ষেত্রে এই আমলগুলো বেশ কার্যকর। প্রতি ওয়াক্তে সর্বোচ্চ ১০ মিনিট লাগে এগুলো আদায় করতে। এগুলো নিয়মিত করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে সকাল-সন্ধ্যার জিকিরগুলো করা। আল্লাহর রাসুল (সা.) সকাল-সন্ধ্যার কিছু জিকির শিখিয়ে গেছেন, যেগুলো অনেক ফজিলতপূর্ণ। রোজার মাসে এগুলো অভ্যাসে পরিণত করা যায়। বিভিন্ন দোয়ার বইতে সেগুলো পাওয়া যাবে।

মনে রাখতে হবে, আখিরাত ও বিচার দিবসের প্রতি সুনিশ্চিত বিশ্বাস মানুষকে সদাসচেতন এবং সব ধরনের পাপাচার থেকে দূরে রাখার জন্য যথেষ্ট। পবিত্র কোরআনে বার বার এই দিনটির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন মহান আল্লাহ। আর আল্লাহর স্মরণ মানুষকে যাবতীয় অন্যায়-অনাচার থেকে দূরে রাখে। আল্লাহকে ভালোভাবে চিনলে ও জানলে মানুষ আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করবে। আর আল্লাহকে চেনা ও জানার ভালো উপায় হলো, নিজেকে আমলের মাঝে ডুবিয়ে রাখা।

সুরা আনফালের দ্বিতীয় আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা ইমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেওয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কালাম, তখন তাদের ইমান বেড়ে যায় এবং তারা নিজ পরওয়ারদেগারের প্রতি ভরসা পোষণ করে।’ এই আয়াতের আলোকে ভেবে দেখা উচিত, সারা দিনে আল্লাহর নাম আমরা যতবার শুনি, ততবার বা একবারও কী আমাদের মন কেঁপে ওঠে? আসলে আল্লাহকে ভালোভাবে চিনি না ও জানি না বলেই আমাদের এই অবস্থা! মহান আল্লাহ যেন আমাদেরকে আলোকিত তথা মুত্তাকি হওয়ার তওফিক দান করেন। আমিন।

লেখক: গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির, ধর্ম ও সমাজ বিশ্লেষক, ধর্মীয় গবেষক ও প্রাবন্ধিক। চেয়ারম্যান – গাউছিয়া ইসলামিক মিশন, কুমিল্লা।